Monday, 31 October 2011

উন্নয়ন কাজের নামে লুটপাট









কাদের গনি চৌধুরী
উন্নয়ন কাজের নামে চলছে ব্যাপক লুটপাট। টেন্ডারের ৬০ ভাগ টাকা চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেট ও ঠিকাদারদের পকেটে। বাকি ৪০ ভাগ টাকার কাজ হচ্ছে দেশে। ফলে কাজের কোনো মানই বজায় থাকছে না। সবচেয়ে বেশি অর্থ লোপাট হচ্ছে সড়ক, ব্রিজ নির্মাণ ও সংস্কার, নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ এবং বিভিন্ন মেরামত কাজে। কাজ না করেও নদী খনন, বাঁধ নির্মাণের নামে পুরো টাকা তুলে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন প্রকল্পের অব্যয়িত টাকা রাজস্ব কোষাগারে জমা বা দাতাগোষ্ঠীকে ফেরত না দিয়ে আত্মসাত্ করা হচ্ছে। এ ধরনের বেশ কিছু অনিয়ম তদন্ত করছে দুদক।
সড়ক ও এলজিইডিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি কাজের সব টেন্ডারই বাগিয়ে নিচ্ছে সরকারি দল। তাই প্রকৃত ঠিকাদাররা কোনো কাজই পাচ্ছেন না। অধিকাংশ ঠিকাদার বেকার হয়ে পড়েছেন। এদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে ১০% কমিশনে কাজ কিনে নিয়ে কোনোমতে পেশায় টিকে আছেন।
এলজিইডির ঠিকাদাররা জানান, কাজের অর্ধেক টাকা তাদের ব্যয় করতে হয় মন্ত্রণালয়, সরকারি দল, চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারের পেছনে। ফলে কাজের মান তারা বজায় রাখতে পারছেন না। এর ফলে যে রাস্তা পাঁচ বছর পর সংস্কার করার কথা সেটি এক বছরেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। একাধিক ঠিকাদার ও এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলজিইডির বিভিন্ন পর্যায়ে কাজের সাড়ে ১৩ পার্সেন্ট, সরকারি দল থেকে কাজ কিনে নিতে দশ পার্সেন্ট, প্রকল্প পরিচালক, কনসালটেম্লট, ল্যাবরেটরি, লোকাল চাঁদাবাজদের ম্যানেজ করতে ১০ পার্সেন্ট, ঠিকাদারের লাভ ১৫ পার্সেন্ট এবং মন্ত্রণালয়কে ১০ পার্সেন্ট ঘুষ দিতে হয়। ঠিকাদাররা জানান, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীকে তিন পার্সেন্ট, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী দুই পার্সেন্ট, উপজেলা প্রকৌশলীকে সাড়ে তিন পার্সেন্ট, সহকারী প্রকৌশলী (সিনিয়র) এক পার্সেন্ট, জুনিয়র এক পার্সেন্ট, উপ-সহকারী প্রকৌশলী হাফ পার্সেন্ট, কাজের কনসালটেম্লট গ্রুপ এক পার্সেন্ট, হিসাব বিভাগ এক পার্সেন্ট, ট্রেজারি বিভাগ হাফ পার্সেন্ট এবং গুণগত মান সার্টিফিকেটের জন্য ল্যাবরেটরিকে দিতে হয় আরও হাফ পার্সেন্ট। এলজিইডির সাড়ে ১৩ পার্সেন্ট ভাগবাটোয়ার ঘটনা ওপেন সিক্রেট। এটা নিয়ে দরকষাকষির প্রয়োজন পড়ে না। আপনা আপনিই নিজ নিজ ডেস্কে এ টাকা চলে যায়।
সড়ক বিভাগের কাজে মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করতে ১০ থেকে ২০ পার্সেন্ট পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। অন্যান্য জায়গায় দিতে হয় আরও ২০ থেকে ২৫ পার্সেন্ট ঘুষ। এটাও ওপেন সিক্রেট। এর জন্যও দরকষাকষির প্রয়োজন পড়ে না। কোথায় কত টাকা দিতে হবে টেন্ডার পাওয়ার আগেই বলে দেয়া থাকে। সরকারি দলের ঠিকাদার থেকে কাজ কিনে নেয়া এবং ঠিকাদারের লভ্যাংশ বাদ দিলে ৪০ পার্সেন্টের বেশি টাকার কাজ হয় না বলে সড়ক ও যোগাযোগ বিভাগের একটি সূত্র জানায়।
ওয়াসার কাজে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় বলে জানান ঠিকাদাররা। ওয়াসার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিতে হয় কাজের ২০ পার্সেন্ট। এদের মধ্যে ভাগ পান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় সহকারী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দফতর। এমডির জন্য ভাগ থাকলেও বর্তমান এমডি ঘুষ খান না
বলে একাধিক ঠিকাদার জানান। এছাড়া কাজ ক্রয়, ঠিকাদারের লাভ এবং অন্যান্য খাতে চলে যায় ৪০ পার্সেন্ট টাকা। বিশেষ করে অগ্রিম আয়কর হিসেবে সাড়ে আট পার্সেন্ট টাকা শুরুতেই কেটে রাখা হয়। নিরাপত্তা জামানত হিসেবে এক বছরের জন্য জমা রাখা হয় আরও ১০ পার্সেন্ট। ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, গত আড়াই বছর ধরে যত টেন্ডার হয়েছে এর সবই পেয়েছেন সরকারি দলের নেতা ও সরকার সমর্থক ঠিকাদাররা। ফলে পেশাদার ঠিকাদারদের থাকতে হয়েছে বেকার । অনেকে সরকারি দলের নেতাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে কাজ করছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর, পিডব্লিউডি, রাজউক, সিটি করপোরেশন, বিআইডব্লিউটিএ, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সব জায়গায় একই অবস্থা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার জানান, তিনি এলজিইডির প্রায় এক কোটি টাকার একটি কাজ কিনে নেন ১৫ লাখ টাকায়। এছাড়াও তাকে এলজিইডিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আরও ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। তিনি জানান, এখনও কনসালটেম্লট গ্রুপ, হিসাব বিভাগ, ট্রেজারি বিভাগ এবং গুণগত মান সার্টিফিকেটের জন্য ল্যাবরেটরিকে তাদের পার্সেন্টেস দেয়া হয়নি। ক্ষোভের সঙ্গে ওই ঠিকাদার জানান, এখন যদি ৭০ ভাগ কাজ করি তাহলে বাবার জমি বিক্রি করে এনে সরকারি কাজ করতে হবে। সড়কের এক প্রকৌশলী জানান, মন্ত্রণালয় ও সওজ কর্মকর্তাদের দাবি মতো টাকা দিতে না পারায় তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাল্পনিক অভিযোগ এনে ওয়ার্ক অর্ডার বাতিলের চেষ্টা করলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
প্রকল্পের অব্যয়িত টাকা আত্মসাত্ : সড়ক ও জনপথ বিভাগ, এলজিইডির অধিকাংশ প্রকল্পের অব্যয়িত টাকা রাজস্বখাতে জমা না দিয়ে আত্মসাত্ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলজিইডির আরডিপি-২১ প্রকল্প ক্লোজিংয়ের সময় প্রায় ১০ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে যায়। এ টাকা রাজস্বখাতে জমা না দিয়ে তত্কালীন পিডি প্রকল্পের অননুমোদিত পূবালী ব্যাংক, ফার্মগেট, ঢাকা’র এসটিডি-৩৪ নম্বর হিসাবের মাধ্যমে আত্মসাত্ করা হয়। বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত ও পল্লী উন্নয়ন পুনর্বাসন প্রকল্প ২০০৪-এও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এ প্রকল্পের অব্যয়িত প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সরিয়ে ফেলা হয়। এ ব্যাপারে দুদকে মামলা হলে দ্রুত তা জমা দিয়ে দেয়া হয়। একইভাবে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প আরডিপি-১৩, ১৮ ও ২৫ প্রকল্পের অব্যয়িত টাকাও আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, সিএইচটি আইডিপি প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটি-কাপ্তাই সড়কের আসাম বস্তিসংলগ্ন ৯৬ মিটার দীর্ঘ ব্রিজের অ্যাপ্রোচ রোড না করে প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ ব্যয় করার লক্ষ্যে শুকনো স্থানে আরও একটি ২০৪ মিটার দীর্ঘ ব্রিজ তৈরি করে প্রায় ২ কোটি টাকা সিএইচটি আইডিপি প্রকল্পের পরিচালকের সহায়তায় লুটপাট করা হয়।
কাজ না করে ৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বিল প্রদানের ঘটনাও ঘটেছে এখানে। এলজিইডির একটি সূত্র জানায়, বরগুনা জেলার পাথরঘাটা, কাকচিরা, বামনা, রাজাপুর, কাটালিয়া সড়কটি সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও ২০০৭ সালে এটি সংস্কার করে এলজিইডি। নামসর্বস্ব পত্রিকায় গোপনে বিজ্ঞাপন দিয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে বরাদ্দ ৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সমুদয় বিল প্রদান করে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করা হয়নি। ঠিকাদার ঘুষ দিয়ে সামান্য কাজ করে পুরো টাকা উঠিয়ে নেয়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সূত্রে জানা যায়, এলজিইডিতে বছরে প্রায় ৬২৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়। এলজিইডির অভ্যন্তরীণ তদন্তে দুর্নীতির গড় অনুমিত হিসাব ১০৩ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে বিগত দু’বছরে প্রধান প্রকৌশলীর দফতরে জমা পড়া অভিযোগ, অভিযোগের তদন্ত এবং দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় হওয়া টাকার অঙ্কের গড় হিসাবে দুর্নীতির এ চিত্র পাওয়া গেছে। গত তিন বছরে ১২৭ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে এলজিইডিতে। এর মধ্যে ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এলজিইডির একটি সূত্র জানায়, প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই শত ভাগ কাজ দেখিয়ে বিল তুলে নেয়া, সরকারি টাকায় ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মাণ, কর্মকর্তাদের স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুলে অবৈধভাবে ওইসব প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ বরাদ্দ দেয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের টাকা অপচয় করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, এলজিইডিতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় গ্রামাঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ ও সড়ক সংস্কার প্রকল্পে। বছরে সড়ক সংস্কারের জন্য সহস্রাধিক ছোট ছোট প্রকল্প হাতে নেয়ার মতো দুর্নীতি হচ্ছে এখানে। এসব প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রথমেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুষ দিতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘুষের কারণে এসব প্রকল্পের ব্যয় শুরু থেকেই বেশি ধরা হয়। কোনো সড়ক উন্নয়নে ৫ কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা দেখানো হয় ৭ কোটি টাকা। প্রকল্প অনুমোদনের পর টেন্ডার প্রক্রিয়ার জালিয়াতি ওপেন সিক্রেট। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, মন্ত্রী ও সচিব প্রভাববিস্তার করেন বলে অভিযোগ আছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী সুযোগ বুঝে আগেই সমঝোতা করে নেন স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে। আর এ সমঝোতার ফল হিসাবে বেশিরভাগ প্রকল্প শত ভাগ বাস্তবায়ন না করেই বিল তুলে নেয়া হয়। বছরের পর বছর একই সড়ক নতুন প্রকল্প হিসাবে নেয়া হয়। এক্ষেত্রে টেন্ডার জালিয়াতি এবং ভুয়া বিলের অভিযোগই বেশি পাওয়া যায়।
এলজিইডিতে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এখানে তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ না করলে কাজ পাওয়া যায় না বলে সূত্র জানায়। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেছে বলে জানা গেছে। দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ৪ ডিসেম্বর সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজ হিসাবে এই প্রধান প্রকৌশলীর সম্পত্তির হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয়া হয়। দুদক তদন্ত করে জানতে পারে, প্রধান প্রকৌশলী তার স্ত্রী সুফিয়া খাতুনের নামে দেড় বিঘা জমির ওপর বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ৬ ইউনিটের এই বাড়ির বর্তমান বাজারমূল্য ১৫ কোটি টাকা। তাছাড়া গাজীপুরে বাগানবাড়ি, কুমিল্লায় দেড়শ’ বিঘা জমি, কাঁচপুরে জমি এবং ৫টি ব্যাংকে স্ত্রী সুফিয়া খাতুন ও মেয়ে বদরুন্নাহার দীনার নামে ১৯ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ঢাকা বিভাগের এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী মো. আতিয়ার রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী খুরশীদ আলমকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা এলজিইডিকে লুটপাট করে খাচ্ছে।

No comments:

Post a comment